ইরান যুদ্ধের প্রভাব গাজায় নতুন করে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। ফলে মানুষ আবারও বাজারে ছুটছেন সামর্থ্য অনুযায়ী যতটা সম্ভব খাবার কিনে রাখতে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজার থেকে কমে গেছে বা একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না।
গাজা সিটি থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত দেখা যাচ্ছে খাদ্য সরবরাহ কমে যাওয়া এবং সীমান্ত ক্রসিং দিয়ে প্রবেশের পথ সংকুচিত হওয়ার মাধ্যমে।
স্থানীয় বাজারগুলোতে ক্রেতারা চেষ্টা করছেন মজুত কমে যাওয়ার আগেই খাবার কিনে রাখতে। অনেকের আশঙ্কা, আজ যা পাওয়া যাচ্ছে কাল তা আর পাওয়া না-ও যেতে পারে।
এই উদ্বেগের মূল কারণ হলো গাজার সীমান্ত ক্রসিংগুলোর ওপর তাদের প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভরতা। গাজায় খাবার, জ্বালানি, ওষুধসহ প্রায় সব মৌলিক পণ্যই ট্রাকের মাধ্যমে ইসরায়েল ও মিসরের সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। যখন এসব ক্রসিং বন্ধ থাকে বা সীমিতভাবে চালু থাকে, তখন তার প্রভাব দ্রুত বাজার, হাসপাতাল ও পানির সরবরাহব্যবস্থায় পড়ে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল গাজার সব ক্রসিং বন্ধ করে দেয়, যখন ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনী ইরানে হামলা শুরু করে। এর ফলে গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং চিকিৎসার জন্য রোগীদের বাইরে নেওয়ার কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
পরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কেরেম আবু সালেম ক্রসিংটি সীমিতভাবে সহায়তা প্রবেশের জন্য খুলে দেয়। তবে প্রবেশের পরিমাণ এখনো খুবই সীমিত। অন্যদিকে মিসরের সঙ্গে রাফাহ ক্রসিং এখনো বন্ধ রয়েছে। ত্রাণ সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমানে যে পরিমাণ ত্রাণ ঢুকছে তা গাজার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক হানান বালখি রয়টার্সকে বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন গাজায় প্রায় ২০০টি ট্রাক ঢুকছে। অথচ পুরো জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ৬০০টি ট্রাক প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, প্রায় ১৮ হাজার মানুষ এখনো গাজা থেকে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তাদের মধ্যে আহত শিশু ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীরাও রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে খাদ্যের দামে। এক মাস আগে যেখানে এক কেজি টমেটোর দাম ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫০ ডলার, এখন তা প্রায় ৪ ডলারে পৌঁছেছে। শসা ও আলুর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
দীর্ঘ যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে বহু পরিবারের আয় আগেই ভেঙে পড়েছে। ফলে তাজা খাবার এখন অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এক ক্রেতা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের কারণে দাম এত বেড়েছে যে মানুষ এখন আর সবজি ও ফল কিনতে পারছে না।’ সাংবাদিক হানি মাহমুদ বলেন, ব্যবসায়ী, দোকান মালিক ও ক্রেতা সবাই একই চিত্র তুলে ধরছেন। কম পণ্য আসছে, দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, আর সব কিছুর দামই বাড়ছে।
গাজা সিটির অনেক বাজারে রান্নার তেল, ময়দা এবং কিছু ক্যানজাত খাবারের মতো প্রয়োজনীয় পণ্য প্রায় পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় সংস্থা ওসিএইচএ ৬ মার্চ এক প্রতিবেদনে জানায়, আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গাজাজুড়ে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দাম ইতোমধ্যে বেড়ে গেছে। বর্তমানে যে গতিতে ট্রাক ঢুকছে, তা বাজারে পণ্যের সরবরাহ বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। অনেক পণ্য কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অথচ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে ছিল। ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বাজার পর্যবেক্ষণে দেখেছিল যে কিছু খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বেড়েছে এবং দাম কিছুটা কমেছে।
কিন্তু এখন ডব্লিউএফপি বলছে, সাম্প্রতিক সীমান্ত বন্ধের ফলে আবারও খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। কিছু ক্রসিং পুনরায় খোলা হলেও বাজারে পণ্যের দাম এখনো অনেক বেশি রয়ে গেছে।
Md Rakib Hossain 



















